বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১১

দুটি কবিতা

খালেদ হোসাইন   এমন নয় যে আমি ধোয়া তুলসীপাতা


 একদিন তুমি আমার ব্যক্ত-অব্যক্ত সব ভাষা বুঝতে পারতে।
যখন থেকে গোয়েন্দাবৃত্তি শুরু হলো তোমার
আমাকে ভুলভাবে পাঠ করতে শুরু করলে তুমি।
তোমার সূক্ষ্ম-তীক্ষ্ন বঙ্কিম বুদ্ধি নিয়ে তোমার অহংকার হলো,
আর নিজের যন্ত্রণাকে বাড়িয়ে তুললে চক্রবৃদ্ধির চক্রান্তে।
এখন তুমি নিঃসঙ্গতার গর্ব করো, তুমি জানোই না যে
সামাজিক শিল্পীর চেয়ে নিঃসঙ্গ কেউ হতেই পারে না।

পাকস্থলীর তাড়নায় মানুষ চিতার মতোই ছুটতে থাকে, জানি।
কিন্তু এ ছাড়াও মানুষের আরো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আছে,
আকাঙ্ক্ষা-অনুভূতি আছে, জানবে না তুমি? লন্ড্রি-ফেরত ধবধবে জামা
সব কিছু ঢেকে ফেলতে পারে না। দরজা-জানালার পর্দা,
ঝকঝকে মেঝে, মসলার গন্ধ ছড়ানো কিচেনের বাইরে এক
অদ্ভুত ছায়াপথ আছে, তোমার আর জানা হলো না।

এখন আর আমার কোনো ধ্বনি বা বাক্য তোমার বোধগম্য নয়।
আমাদের কথোপকথন দূরতম দুই গ্রহের ভাষায়। আমি হাঁ করলেই
তুমি বুঝে ফেলো, কী আমি বলতে চাই, আদতে যা আমার মস্তিষ্কের
কোনো অন্ধিসন্ধিতে সঞ্চিত ছিল না। আমি মুখ বন্ধ রাখলেও
তুমি বুঝে ফেলো আমার গোপন দুরভিসন্ধি। আমি চোখ বন্ধ রাখলে
তুমি চোখের পাতা টেনে দেখে নাও, কে আমার স্বপ্নের ভেতর এসে
স্বর্গের নটিনীর মতো আমার চিত্তকে আপ্লুত করে তুলছে।

এমন নয় যে আমি ধোয়া তুলসীপাতা। আমার গায়ে ধুলো এসে বসে,
ঘাম হয়, মানবিক প্রবৃত্তিকে আমি তেমন জয় করতেও পারি না।
এমন নয় যে গড়পড়তা মানুষের চেয়ে আমার মাথা উঁচু। যেকোনো
জনারণ্যে আমি ঘাসের পাতার মতো মিশে যাই। ক্ষমা চাইবার মতো কিছু
অন্যায়, ক্ষমার অযোগ্য গোপন কিছু পাপ আমারও রয়েছে।
আছে একটামাত্র জীবন নিয়ে যৎসামান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার মোহ।
স্বেচ্ছায়, সানন্দে।
কারণ আমি কোনো মহামানব নই, আমার স্বপ্নগুলো অভ্রস্পর্শী নয়,
ওরা ধুলোর সঙ্গে ওড়াউড়ি করে, আমার চুলের অরণ্যে ঢুকে পড়ে_
যতটা আনন্দ দেয়, বিব্রত করে তার চেয়ে বেশি।

এই আমাকে তুমি আর চিনতেই পারো না। মমতাশূন্য এক
ধবল কোমল বিছানায় আমি শুয়ে থাকি, রুচি ও যত্নের চিহ্ন
বাতিঘরের মতো জ্বলজ্বল করে, কিন্তু আমার ঘুম আসে না।

আমার ঘুম আসবেও না, কেননা জন্মের আগে আমি দীর্ঘকাল
ঘুমিয়ে ছিলাম, মৃত্যুর পর আমি অনন্তকাল ঘুমিয়ে থাকব।

আমার ভাষা তুমি আর কোনো দিন বুঝতেই পারবে না।


নটেগাছটি মুড়িয়ে গেলে

নটেগাছটি মুড়িয়ে গেলে আমাকে তুমি আর পাবে না
ওই আঙিনায় ফুটবে না আর কামিনী বা হাস্নুহেনা।

একচিলতে মুচকি হাসি ছোট্ট মাছের ঘাইয়ের মতো
জলের বুকে মিলিয়ে যাবে, জল যে জলে অনাবৃত।

দূর-দিগন্তে পা বাড়ালে দেখবে না আর আমার ছায়া
পায়ের নিচে পোড়োজমি, চতুষ্পাশ্র্বে অলীক, মায়া।

আষাঢ় মাসের বৃষ্টি হয়ে মুষলধারে ঝরবে আঁধার
সকল দৃশ্য অন্তর্হিত_জল ও ডাঙা, বন ও বাদাড়।

নটেগাছটি মুড়িয়ে গেলে ফুরিয়ে যাব আমি, সোনা!
ধ্বনি কিংবা প্রতিধ্বনি আর যাবে না কোথাও শোনা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন