শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১১

অ্যান্ড দ্য নোবেল গোস টু...

রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী

 

১৮ সদস্যের সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সচিব পিটার এঙ্গলুন্ড অক্টোবরের ৬ কিংবা ১৩ তারিখ বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ছয়টায় একাডেমির ঐতিহ্যবাহী রাজসিক সাদা রঙের দরজা খুলে বেরিয়ে এসে বিশ্বমিডিয়ার সামনে কোন সাহিত্যিকের নাম ঘোষণা করবেন, সেটা শোনার জন্য আমরা সবাই কমবেশি উদগ্রীব। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে শুরু হওয়া প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ বছরের এপ্রিল মাসে বরফ গলার সময় একাডেমি ১৫-২০ জন সাহিত্যিকের একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেছিল, যে তালিকা থেকে পরের মাসেই পাঁচজনের একটি চূড়ান্ত তালিকা তৈরি হয়েছে। গ্রীষ্মকালজুড়ে (জুন থেকে আগস্ট) চলেছে ওই পাঁচজন সাহিত্যিকের রচনার পুঙ্খানুপুঙ্খ পঠন-পাঠন ও বিশ্লেষণ। সেপ্টেম্বর মাসে হয়েছে মনোনীত ওই পাঁচজনের লেখালেখির গুণাগুণ বিচার করে মূল্যায়ন। এখন ভোটদান পর্ব। যাঁর পক্ষে কমিটির অর্ধেকের বেশি সদস্য ভোট দেবেন, তিনিই জিতবেন ২০১১ সালের নোবেল। ১৮৬৬ সালে বিধ্বংসী ডিনামাইট আবিষ্কার করে অঢেল ধন-সম্পদের মালিক বনে যাওয়া আলফ্রেড নোবেল মানবকল্যাণের স্বার্থে, শান্তির পক্ষে তাঁর ধন-সম্পদকে পুঁজি করে এ পুরস্কারের প্রবর্তন করেন।
একাডেমির নিয়মবিধি অনুযায়ী পাঁচজনের এই হ্রস্ব তালিকায় কার কার নাম আছে, সেটা জানতে আমাদের অর্ধশতকাল অপেক্ষা করতে হবে। কানাঘুষায় এবং বাজিকরদের তথ্য অনুযায়ী পত্রপত্রিকা ও ইন্টারনেটের মারফতে কিছু নাম আমরা পাচ্ছি। আর বিশ্বসাহিত্যের আলোচিত মহৎ সাহিত্যিকেরা, বিশেষ করে, বহুদিন ধরে যাঁরা উপেক্ষিত, তাঁরা তো আছেনই আমাদের তালিকায়। এভাবে ফি-বছর আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করি আমাদের প্রিয়, পরিচিত লেখক বা কবির নাম শুনব বলে। নাম ঘোষণার পর কোনো বছর খুশি হই, কোনো বছর অভিমানে রেগে যাই, আবার না জেনে গালাগালিও করি বা অর্থহীন তুলনামূলক আলোচনায় মশগুল হই।
প্রশ্ন হলো, এ বছর কার ভাগ্যের শিকেয় জুটবে বিশ্বসাহিত্যের এই সম্মানজনক এবং ব্যাপকভাবে আলোচিত ও বিতর্কিত পুরস্কার। গত বছর স্প্যানিশভাষী লাতিন আমেরিকার ঘরে গিয়েছিল নোবেল। এবার কোন অঞ্চলে যাচ্ছে নোবেল? আফ্রিকায়, ইউরোপে, উত্তর আমেরিকায়, অস্ট্রেলিয়ায় নাকি আমাদের এশিয়ায়? ফেসবুক, টুইটার, ইন্টারনেটের মাধ্যমে দানা বাঁধা ‘আরব বসন্ত’ নামের যে আন্দোলন এ বছর আরব বিশ্বকে কাঁপিয়ে দীর্ঘকাল যাবৎ ক্ষমতায় জেঁকে বসে থাকা একচ্ছত্র অধিপতিদের গদিচ্যুত করল—সে ঘটনারই সূত্র ধরে আমরা কি অনুমানে ধরে নিতে পারি যে আরবের কোনো সাহিত্যিক এ বছরের পুরস্কারটা পাবেন। নোবেলের জয়মাল্যে ভূষিত একমাত্র এবং প্রথম আরবের লেখক মিসরের নাগিব মাহফুজের জন্মশর্তবার্ষিকীর বছরে আরব দুনিয়ার সবচেয়ে মশহুর কবি সিরীয় আলী আহমদ সাইদ ওরফে আদোনিস, আলজেরিয়ার ফরাসিভাষী লেখিকা, চলচ্চিত্রকার আসিয়া জেবার কিংবা প্যারিস-নিবাসী মরক্কোর কবি ও ঔপন্যাসিক তাহের বিন জেলুনের পুরস্কারপ্রাপ্তি আরব ও মুসলিম দুনিয়ায় আনন্দের জোয়ার বইয়ে দেবে। বিশ্ববরেণ্য কেনিয়ান লেখক নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর নাম সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে জোরেশোরে শোনা গিয়েছিল গত বছর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাননি। এ বছর কি তিনি বা তাঁর সতীর্থ সোমালিয়ার লেখক নুরুদ্দিন ফারাহ পুরস্কারটা পাবেন?
হারুকি মুরাকামি বা মুরাকামি হারুকি আজ হোক, কাল হোক নোবেল পাবেনই। দেখতে হবে নোবেল কমিটি এ বছরই তাঁকে চূড়ান্ত বিবেচনায় আনছে কি না। তাহলে জাপানসহ সারা এশিয়া হেসে উঠবে। রবীন্দ্রনাথের পর দ্বিতীয় বাঙালি হিসেবে মহাশ্বেতা দেবী কি পুরস্কারটা পাবেন? তাঁর নাম অতীতে মনোনয়ন তালিকায় ছিল বলে গুজবে জানা যায়। অস্ট্রেলিয়ার কবি লেস মারির নাম শোনা যাচ্ছে বছর কয়েক ধরে। তিনি অস্ট্রেলিয়ায় খুবই বরেণ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ। ফিলিস্তিনের শত্রু ইসরায়েলের লেখক অ্যামোস ওজ পেয়েও যেতে পারেন। উৎকৃষ্ট মানের এই লেখক শান্তির পক্ষে কথাবার্তা বলে স্বদেশে বিতর্কিতও হয়েছেন। নোবেল কমিটির বিবেচনায় ইদানীং দেখা যাচ্ছে, ক্রোধী (লেখনীতে) আপসহীন লেখকদের তাঁরা সম্মানিত করছেন। সেই মোতাবেক দক্ষিণ কোরিয়ার কবি দ্রোহী কো উন নোবেলের যোগ্যতম দাবিদারদের একজন। কবি হিসেবেও অসাধারণ।
কানাডার শক্তিশালী ছোটগল্পকার অ্যালিস মুনরো কিংবা ঔপন্যাসিক মার্গারেট অ্যাটউডও পেয়ে যেতে পারেন নোবেল। টনি মরিসনের পর আর কোনো মার্কিন সাহিত্যিক পুরস্কারটি পাননি। অথচ ফিলিপ রথ, করম্যাক ম্যাককার্থি, ডন ডে লিলো, টমাস পিঞ্চন কিংবা জয়েস ক্যারল ওটসের যে কেউ-ই পুরস্কারটি পেতে পারেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-নিবাসী ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক সালমান রুশদি নোবেলের যোগ্যতম দাবিদারদের একজন। কিন্তু রাজনীতির কারণে শেষ অবধি তাঁর ভাগ্যে নোবেল জোটে কি না কে জানে!
মারিও বার্গাস য়োসা পেয়ে যাওয়ায় কার্লোস ফুয়েন্তেসের সম্ভাবনা কমেই গেছে বলে মনে হয়। হিস্পানি আমেরিকা থেকে সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে নাম নেওয়া যায় উরুগুয়ের লেখক এদুয়ার্দো গালেয়ানো, আর্জেন্টিনার কবি হুয়ান হেলমান এবং নিকারাগুয়ার কবি এর্নেস্তো কার্দেনাল প্রমুখের। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজক, ফুটবলের দেশ ব্রাজিল বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় মাচাদু দে আসিস, কার্লুস দ্রামন্দ দে আনদ্রাদে, ক্লারিস লিসপেক্তোর এবং জোর্জে আমাদুর মতো লেখক-কবি উপহার দিয়েছে। পর্তুগিজভাষী এ দেশটির কোনো সাহিত্যিক আজ পর্যন্ত নোবেল কমিটির চূড়ান্ত বিবেচনায় আসেননি। লেখিকা নেলিদা পিনয়ন কিংবা লেখক রুবেম ফোন্সেকা বা জোয়াউ উবালদু রিবেইরুর কথা ভাবতেই পারে একাডেমি।
১১০ বছরের ইতিহাসে নোবেল প্রাপক সাহিত্যিকদের তালিকায় ইউরোপের লেখক-কবিদের পাল্লাই ভারী। ডাচ্ ভাষার কেউ পাননি এ পুরস্কার। সুতরাং পেতে পারেন কবি ও লেখক কেইস নুটেবুম। খোদ সুইডেনের বয়োজ্যেষ্ঠ কবি টোমাস ট্রান্সট্রমার কি পাবেন এবার? ইতালির ভিন্নধর্মী লেখক ক্লাউদিও মার্গ্রিস কিংবা শিক্ষাবিদ-পণ্ডিত-ঔপন্যাসিক উমবের্তো একো, বড় বড় সব সাহিত্য পুরস্কার জেতা আলবেনিয়ার ইসমাইল কাদারে, হাঙ্গেরির পিটার নাদাস বা পিটার এস্তেরাজি, সুইডেনের বিখ্যাত ঔপন্যাসিক পার ওলফ এনকভিস্ট, আইরিশ ইয়ান ম্যাকওয়ান বা জন বানভিল—এঁদের যে কেউই পেতে পারেন। স্পেনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক মরক্কোবাসী হুয়ান গোইতসোলো কিংবা অপেক্ষাকৃত তরুণ হাবিয়ের মারিয়াস পেলেও নোবেল পুরস্কারের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না। আর আমাদের অনেকের প্রিয় চেক লেখক মিলান কুন্দেরাকে আর কতকাল অপেক্ষা করতে হবে? নাকি শেষ পর্যন্ত তলস্তয়, বোর্হেস, দারবিশ প্রমুখের মতো না পাওয়া তালিকায় নাম লেখাবেন?
১৯৯৬ সালের পর কোনো কবি আর জেতেননি। এবারও কি কবিতা উপেক্ষিত থেকে যাবে? সব জল্পনাকল্পনার অবসান হবে শিগগিরই।

বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১১

দুটি কবিতা

খালেদ হোসাইন   এমন নয় যে আমি ধোয়া তুলসীপাতা


 একদিন তুমি আমার ব্যক্ত-অব্যক্ত সব ভাষা বুঝতে পারতে।
যখন থেকে গোয়েন্দাবৃত্তি শুরু হলো তোমার
আমাকে ভুলভাবে পাঠ করতে শুরু করলে তুমি।
তোমার সূক্ষ্ম-তীক্ষ্ন বঙ্কিম বুদ্ধি নিয়ে তোমার অহংকার হলো,
আর নিজের যন্ত্রণাকে বাড়িয়ে তুললে চক্রবৃদ্ধির চক্রান্তে।
এখন তুমি নিঃসঙ্গতার গর্ব করো, তুমি জানোই না যে
সামাজিক শিল্পীর চেয়ে নিঃসঙ্গ কেউ হতেই পারে না।

পাকস্থলীর তাড়নায় মানুষ চিতার মতোই ছুটতে থাকে, জানি।
কিন্তু এ ছাড়াও মানুষের আরো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আছে,
আকাঙ্ক্ষা-অনুভূতি আছে, জানবে না তুমি? লন্ড্রি-ফেরত ধবধবে জামা
সব কিছু ঢেকে ফেলতে পারে না। দরজা-জানালার পর্দা,
ঝকঝকে মেঝে, মসলার গন্ধ ছড়ানো কিচেনের বাইরে এক
অদ্ভুত ছায়াপথ আছে, তোমার আর জানা হলো না।

এখন আর আমার কোনো ধ্বনি বা বাক্য তোমার বোধগম্য নয়।
আমাদের কথোপকথন দূরতম দুই গ্রহের ভাষায়। আমি হাঁ করলেই
তুমি বুঝে ফেলো, কী আমি বলতে চাই, আদতে যা আমার মস্তিষ্কের
কোনো অন্ধিসন্ধিতে সঞ্চিত ছিল না। আমি মুখ বন্ধ রাখলেও
তুমি বুঝে ফেলো আমার গোপন দুরভিসন্ধি। আমি চোখ বন্ধ রাখলে
তুমি চোখের পাতা টেনে দেখে নাও, কে আমার স্বপ্নের ভেতর এসে
স্বর্গের নটিনীর মতো আমার চিত্তকে আপ্লুত করে তুলছে।

এমন নয় যে আমি ধোয়া তুলসীপাতা। আমার গায়ে ধুলো এসে বসে,
ঘাম হয়, মানবিক প্রবৃত্তিকে আমি তেমন জয় করতেও পারি না।
এমন নয় যে গড়পড়তা মানুষের চেয়ে আমার মাথা উঁচু। যেকোনো
জনারণ্যে আমি ঘাসের পাতার মতো মিশে যাই। ক্ষমা চাইবার মতো কিছু
অন্যায়, ক্ষমার অযোগ্য গোপন কিছু পাপ আমারও রয়েছে।
আছে একটামাত্র জীবন নিয়ে যৎসামান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার মোহ।
স্বেচ্ছায়, সানন্দে।
কারণ আমি কোনো মহামানব নই, আমার স্বপ্নগুলো অভ্রস্পর্শী নয়,
ওরা ধুলোর সঙ্গে ওড়াউড়ি করে, আমার চুলের অরণ্যে ঢুকে পড়ে_
যতটা আনন্দ দেয়, বিব্রত করে তার চেয়ে বেশি।

এই আমাকে তুমি আর চিনতেই পারো না। মমতাশূন্য এক
ধবল কোমল বিছানায় আমি শুয়ে থাকি, রুচি ও যত্নের চিহ্ন
বাতিঘরের মতো জ্বলজ্বল করে, কিন্তু আমার ঘুম আসে না।

আমার ঘুম আসবেও না, কেননা জন্মের আগে আমি দীর্ঘকাল
ঘুমিয়ে ছিলাম, মৃত্যুর পর আমি অনন্তকাল ঘুমিয়ে থাকব।

আমার ভাষা তুমি আর কোনো দিন বুঝতেই পারবে না।


নটেগাছটি মুড়িয়ে গেলে

নটেগাছটি মুড়িয়ে গেলে আমাকে তুমি আর পাবে না
ওই আঙিনায় ফুটবে না আর কামিনী বা হাস্নুহেনা।

একচিলতে মুচকি হাসি ছোট্ট মাছের ঘাইয়ের মতো
জলের বুকে মিলিয়ে যাবে, জল যে জলে অনাবৃত।

দূর-দিগন্তে পা বাড়ালে দেখবে না আর আমার ছায়া
পায়ের নিচে পোড়োজমি, চতুষ্পাশ্র্বে অলীক, মায়া।

আষাঢ় মাসের বৃষ্টি হয়ে মুষলধারে ঝরবে আঁধার
সকল দৃশ্য অন্তর্হিত_জল ও ডাঙা, বন ও বাদাড়।

নটেগাছটি মুড়িয়ে গেলে ফুরিয়ে যাব আমি, সোনা!
ধ্বনি কিংবা প্রতিধ্বনি আর যাবে না কোথাও শোনা।